অনলাইনে যারা নতুন কাজ শুরু করেন তাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটা আমি পেয়েছি সেটা হচ্ছে- কাজ করার পর টাকা পাবো তো? সেই টাকা দেশে কীভাবে আনবো? এই যে টাকা দেশে আনার ব্যাপারটা, এটা আপনার লাগবেই। কারণ আপনি কাজটা করছেন ডলারে। সেই ভার্চুয়াল ডলার দেশে আনবেন কাগুজে টাকায়। কিন্তু কীভাবে? সত্যি আনা সম্ভব তো?
আজকে আমরা এই বিষয়টাই জানবো। কারণ আপনি কাজ করার পর সেই টাকা যদি দেশে না আনতে পারেন তাহলে কীভাবে হবে? সুতরাং কাজ শুরু করার আগেই আপনাকে টাকা দেশে আনার রাস্তাটা ক্লিয়ার রাখতে হবে। সেটা কীভাবে করবেন তা নিয়ে আজকে লিখতে বসেছি। নতুনদের বোঝার সুবিধার্থে এই লেখায় বরাবরের মতো কোনো কঠিন শব্দ ব্যবহার করা হবে না। সবচেয়ে সহজভাবেই বলতে চেষ্টা করবো। এতে করে কিছু গ্রামাটিক্যাল এরর হতে পারে, তবে সেটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। বিষয়টি জানা ও শেখাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
ফ্রিল্যান্সিং কাজের অর্থ দেশে আনার অনেক পদ্ধতি আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সহজবোধ্য এবং ঝামেলাহীন পদ্ধতির নাম পেওনিয়ার।
যা যা শিখবো এই টিউটোরিয়াল থেকে:
- পেওনিয়ার কি?
- পেওনিয়ার প্রিপেইড মাস্টারকার্ড
- পেওনিয়ার প্রিপেইড মাস্টারকার্ড আবেদন
- পেওনিয়ার মাস্টারকার্ড সাইন আপ ধাপসমূহ
- এখন আপনার পালা
- কীভাবে উপার্জন অর্থ দেশে আনবেন?
- পেওনিয়ারের মাধ্যমে মার্কেটপ্লেস থেকে অর্থ উত্তোলন
- পেওনিয়ারের মাধ্যমে মার্কেটপ্লেস ছাড়া পেমেন্ট নেয়া
- পেওনিয়ার সম্পর্কিত কিছু সিক্রেটস প্রশ্ন এবং উত্তর
- আর কিছু জানার আছে?
পেওনিয়ার কি?
পেওনিয়ার একটি ফিন্যানসিয়াল বিজনেস সার্ভিস। যার মাধ্যমে আপনি এক স্থানের অর্থ অন্য কারও কাছে নিতে পারবেন। পেওনিয়ার ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে মাস্টারকার্ড-এর রেজিস্ট্রার মেম্বার। পেওনিয়ার কাজটা কীভাবে করে সেটা যদি আমরা জানতে পারি তাহলে ব্যাপারটা আরও ক্লিয়ার হবে। পেওনিয়ার মাস্টারকার্ড ব্রান্ডেড একটি এটিএম কার্ড তার মেম্বারদের বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। যার মাধ্যমে আপনি বিশ্বের ২০০ দেশের মাস্টারকার্ড ব্রান্ডেড এটিএম বুথ থেকে লোকাল কারেন্সিতে অর্থ তুলতে পারবেন।
লোকাল কারেন্সি মানে- ধরুন আপনি বাংলাদেশে আছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ (যেমন ব্রাক, ডাচবাংলা ব্যাংক) থেকে টাকা তুলতে পারবেন। আবার আপনি যখন ইন্ডিয়াতে থাকবেন তখন ঐ দেশের যেসব এটিএম বুথে মাস্টারকার্ড লোগো থাকবে সেখান থেকে আপনি ইন্ডিয়ান রুপী তুলতে পারবেন। আমেরিকায় যদি থাকেন তাহলে ইউএস ডলার তুলতে পারবেন সে দেশের এটিএম বুথ থেকে। কী, মজা না?
পেওনিয়ার প্রিপেইড মাস্টারকার্ড
আপনি যখন পেওনিয়ারে রেজিস্ট্রার করে ওদের মেম্বার হবেন, তখন আপনাকে একটি মাস্টারকার্ড পাঠাবে ওরা। উল্লেখ্য, কার্ড পেতে কোনো অর্থ প্রদান করতে হবে না পেওনিয়ারকে। যদি কেউ আপনার কাছে এজন্য অর্থ দাবি করে তাহলে সে প্রতারক। তার কাছ থেকে সাবধান থাকুন। কীভাবে আপনি একটি পেওনিয়ার মাস্টারকার্ড পাবেন সেটা স্টেপ বাই স্টেপ নিচে বর্ণনা করা হলো। কোথাও বুঝতে সমস্যা হলে মন্তব্য করে জিজ্ঞেস করুন। দ্রুত উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হবে।
পেওনিয়ার প্রিপেইড মাস্টারকার্ড আবেদন / সাইন আপ ফরম
পেওনিয়ার সাইন আপ: ধাপ -০১
উপরের সাইন আপ ফরমে ক্লিক করার পর যে পেজটি আসবে, সেখানে উপরের স্ক্রিনশটের মতো একটি ছোট ফরম পাবেন। এখানে আপনার নাম, ইমেইল এড্রেস এবং জন্মতারিখ লিখে নেক্সট বাটনে ক্লিক করবেন। তাহলে দ্বিতীয় ধাপ আপনার সামনে চলে আসবে। উল্লেখ্য, এখানে আপনার নাম এবং জন্মতারিখ দেবেন আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টে যেভাবে লেখা আছে সেভাবে।
পেওনিয়ার সাইন আপ: ধাপ -০২
এটা দ্বিতীয় ধাপ। এই ধাপে আপনার দেশের নাম (যেমন বাংলাদেশ), আপনার ঠিকানা (যে ঠিকানায় পেওনিয়ার আপনাকে কার্ড পাঠাবে, সেটা), মোবাইল নাম্বার বা টেলিফোন নাম্বার লিখে নেক্সট বাটনে ক্লিক করুন।
পেওনিয়ার সাইন আপ: ধাপ -০৩
পেওনিয়ার সাইন আপের এটা তৃতীয় অধ্যায়। এটাকে সিকিউরিটি ডিটেইলস বলা হয়। এখানে আপনার পেওনিয়ারে লগিন করার জন্য পাসওয়ার্ড এবং একটি সিকিউরিট কোশ্চেন উত্তরসহ এড করতে হবে। মনে রাখবেন- পেওনিয়ারে আপনার একাউন্টে লগিন করার জন্য ইউজার হচ্ছে আপনার ইমেইল আর পাসওয়ার্ড হলো এই পাসওয়ার্ডটি। তাই এখানে যে পাসওয়ার্ড দিলেন তা অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না।
পেওনিয়ার সাইন আপ: ধাপ -০৪
এটাই মূলত ফাইনাল ধাপ। আর এই ধাপটা অবশ্যই অবশ্যই খুবই সাবধানে পূরন করবেন। শুরুতে Type of Government ID-এর স্থানে সিলেক্ট করবেন প্রমান হিসেবে কী দেবেন? আপনি অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র বা ন্যাশনাল আইডি (National ID) সিলেক্ট করবেন।
ন্যাশনাল আইডি কার্ডে আপনার নাম যেভাবে লেখা আছে সেভাবে নিচের ঘরটাতে লিখবেন। তার পরের ঘরটাতে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের নাম্বারটা লিখবেন। দেশ সিলেক্ট করে বাংলাদেশ দেবেন। প্রিভিউতে দেখুন সব ঠিক আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে নিচের তিনটা অপশনে টিক চিহ্ন দিন। তারপর ORDER বাটনে ক্লি করুন।
পেওনিয়ার সাইন আপ: কনগ্রাচুলেশনস!
এখন আপনার পালা
পেওনিয়ার একাউন্ট হলো। পেওনিয়ার মাস্টারকার্ড পেয়ে যাচ্ছেন কিছুদিনের মধ্যে। এবার তবে কি? এবার হচ্ছে পরিশ্রম। আপওয়ার্ক, ফাইভআরআর, পিপ্যল পার আওয়ার, গুরু, ফ্রিল্যান্সার এরকম সাইটগুলোতে প্রোফাইল তৈরি করে আপনি যেসব কাজ পারেন সেগুলোর জন্য বিড করতে থাকুন। কাজ পেয়ে গেলে কাজ করুন। কাজ কমপ্লিট করলে পেমেন্ট পেয়ে যাবেন। সেই পেমেন্ট সহজেই নিয়ে আসবেন আপনার পেওনিয়ার একাউন্টে। তারপর পেওনিয়ার মাস্টারকার্ড দিয়ে যেকোনো বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করুন। অথবা পেওনিয়ার একাউন্ট থেকে সরাসরি ব্যাংক একাউন্টেও ডলার উইথড্র করে টাকা ক্যাশ করা যায়।
কীভাবে উপার্জন অর্থ দেশে আনবেন?
অনেক পদ্ধতি আছে। আজকে আমরা শুধু পেওনিয়ার মানে সবচেয়ে ভালো পদ্ধতিটির কথাই বলবো। আশা করি এই লেখাটি আপনাকে বুঝতে সহযোগিতা করবে, ফ্রিল্যান্সিং-এ উপার্জিত অর্থ অবশ্যই আপনি পাবেন এবং এটা একটা সহজ।
পেওনিয়ারের মাধ্যমে মার্কেটপ্লেস থেকে অর্থ উত্তোলন
মার্কেটপ্লেস হিসেবে আমরা এখানে আপওয়ার্ক বেছে নিচ্ছি। প্রথমেই আপনার আপওয়ার্ক একাউন্টে ইউজার নেম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগিন করুন। তারপর সেটিংস অপশনে যান। ডানপাশে উপরে যেখানে আপনার নাম লেখা আছে ওখানে ড্রপডাউনে সেটিংস পাবেন। সেটিংস পেজে আসার পর বামপাশে GET PAID-এ ক্লিক করুন।
পেজটা পেন হবে, এখান থেকে ADD A PAYMENT METHOD-এ ক্লিক করে পেওনিয়ার বাছাই করুন: Setup ক্লিক করলে উইন্ডো ওপেন হবে। সেখানে আপনার পেওনিয়ারের ইউজার নেম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগিন করে পারমিশন দিতে হবে। তখন একটি ম্যাসেজ পাবেন। যেখানে বলা হবে আগামী তিন দিনের মধ্যে আপনার কার্ডটি আপওয়ার্কে একটিভ হবে আর তখন পেমেন্ট উইথড্র করতে পারবেন। দ্যাটস অল!
পেওনিয়ারের মাধ্যমে মার্কেটপ্লেস ছাড়া পেমেন্ট নেয়া
হ্যাঁ, আপনি যদি কোনো মার্কেটপ্লেসে কাজ নাও করেন, অর্থাৎ আপনি যদি সরাসরি ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করেন তাহলেও পেওনিয়ারের মাধ্যমে পেমেন্ট নিতে পারবেন। কীভাবে? সেটাই বলবো এখানে। পেওনিয়ারে একটা সার্ভিস আছে, যাকে বলে: USPS বা United States Payment Service. এটার সাহায্যে যে কারও কাছ থেকে পেমেন্ট নিতে পারেন। এজন্য ক্লায়েন্টকে পেমেন্ট রিক্যুয়েস্ট করতে হয়। তখন ক্লায়েন্ট পে করে দেয় এবং সরাসরি সেই পেমেন্ট আপনার পেওনিয়ার একাউন্টে চলে আসে। আর পেওনিয়ার একাউন্টে অর্থ আসা মানেই পেওনিয়ার মাস্টারকার্ড দিয়ে সেই অর্থ আপনিও পেয়ে যাচ্ছেন।
পেওনিয়ার সম্পর্কিত কিছু সিক্রেটস প্রশ্ন এবং উত্তর
- মার্কেটপ্লেস থেকে পেওনিয়ারে সাইনআপ করবেন না! যদি আপনি মার্কেটপ্লেস, যেমন আপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার, ফাইভআরআর ইত্যাদির মাধ্যমে পেওনিয়ারের একাউন্ট ওপেন করেন, তাহলে মনে রাখুন, প্রাইভেট লোড; যেমন আপনার পেওনিয়ার একাউন্ট থেকে অন্য পেওনিয়ার একাউন্টে পেমেন্ট সেন্ডও করতে পারবেন না, আনতেও পারবেন না! সুতরাং বুঝে শুনে একাউন্ট ওপেন করুন।
- পেওনিয়ার মাস্টারকার্ড আপনার লাগবে তো? মনে রাখুন, আপনি যদি অনলাইনে অর্থ উপার্জন করতে না চান, তাহলে অযথা এই কার্ডের জন্য আবেদন করবেন না। এই কার্ড শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা, অনলাইন এন্টারপ্রেনারদের জন্য। সুতরাং যদি আপনি এরকম কেউ না হয়ে থাকেন তাহলে অযথা এখানে সময় নষ্ট করবেন না। দেশের বদনাম করবেন না।
- পেওনিয়ারের মাধ্যমে পেপাল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। পেপাল থেকে আমরা বঞ্চিত, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেহেতু পেপাল একাউন্ট মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে বা ইউএস ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে ভেরিফাইড করা যায়, তাই অনেকে পেওনিয়ার মাস্টারকার্ড বা পেওনিয়ার থেকে প্রাপ্ত আমেরিকান ব্যাংক একাউন্ট দিয়ে পেপাল ভেরিফাইড করে থাকেন। যদিও তা অনৈতিক এবং রিস্ক ফ্রি নয়। এভাবে ওপেন করা পেপাল একাউন্ট যেকোনো সময় লিমিট হয়ে যেতে পারে। ফলে পেপালে থাকা ডলার আর মুভ করতে পারবেন না। সুতরাং এ থেকে বিরত থাকুন।
- পেওনিয়ার মাস্টারকার্ডের সাথে ২৫ ডলার বোনাস। আপনার কার্ডে যখন সর্বমোট ১০০ ডলার রিসিভ হবে, তখনই কেবল ২৫ ডলার বোনাস পাবেন আপনি। তার আগে অবশ্যই নয়। তবে ১০০ ডলার একসাথেই হতে হবে, তা নয়। ২০ ডলার, ৩০ ডলার ২৫ ডলার করে বিভিন্ন এমাউন্ট মিলেও যদি ১০০ ডলার হয়, আপনি বোনাস পাবেন। এবং অবশ্যই অবশ্যই এই পৃষ্ঠায় থাকা লিংকে ক্লিক করে আবেদন করলেই কেবল আপনি বোনাস পাবেন। অন্যথায় নয়।
- প্রতারকদের কাছ থেকে সাবধান থাকুন। অনেকেই দুই তিন হাজার টাকার বিনিময়ে আপনাকে মাস্টারকার্ড এনে দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে থাকবে। কিন্তু জেনে রাখুন, তারা প্রতারক। তারা আপনাকে যে কার্ড দেবে, সেটা ব্যান হয়ে যেতে পারে। আর তখন আপনি তাদের পাবেন না। আর পেওনিয়ারের রুলস অনুযায়ী, আপনার একাউন্ট একাউন্ট একবার ব্যান হলে আর কখনোই আপনি পেওনিয়ার একাউন্টের মালিক হতে পারবেন না। অর্থাৎ একবার ব্যান মানে আজীবনের জন্য ব্যান। সুতরাং সাবধান!
আর কিছু জানার আছে?
পেওনিয়ার একাউন্ট বা মাস্টারকার্ড সংক্রান্ত আর কিছু জানার আছে? থাকলে আমাকে প্রশ্ন করুন নিচে। অন্য যেকারও চেয়ে আপনাকে আমি বেশি হেল্প করতে পারবো। কেন? কারণ আমি পেওনিয়ারের অফিসিয়াল আরপিএ (RPA). সুতরাং যেকোনো সমস্যা হলে, বুঝতে অসুবিধা হলে আমাকে জানান নিম্নে মন্তব্য করে। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ম্যাসেজ না পাঠিয়ে নিচে কমেন্ট আপনার সমস্যার কথা জানান। ফলে আমি যখন উত্তর দেবো, তখন আপনার পাশাপাশি আরও অনেক উপকৃত হবে।
আর যদি আপনি ডেডেকেটেড হয়েই থাকেন যে, আপনি অনলাইনে ক্যারিয়ার গড়বেন, তাহলে পেওনিয়ার প্রিপেইড মাস্টারকার্ড লাগবে। আর যেহেতু এই কার্ড আপনার হাতে আসতে কমবেশি ২ মাসের মতো লেগে যাবে, সুতরাং এখুনি আবেদন করে কার্ডটি নিয়ে রাখতে পারেন। কারণ এই কার্ডটি আপনার লাগবেই!
ধন্যবাদ সবাইকে। ভালো থাকুন, আনন্দে থাকুন।
